‘আমি ভীষণ কেঁদেছিলাম’

actor-2

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ ছাড়াও পুরো বাঙালি জাতি নানাভাবে অংশ নিয়েছে। কেউ গান গেয়ে, কেউ বা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে উজ্জীবিত করেছেন। বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজকে যারা সংগঠিত করেছেন তাদের অন্যতম সৈয়দ হাসান ইমাম।

তিনি একাধারে সুসংগঠক, অভিনেতা ও নির্মাতা। সালেহ আহমেদ ছদ্মনামে স্বাধীন বাংলা বেতারে নিয়মিত সংবাদ পাঠ করতেন সৈয়দ হাসান ইমাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও কলা-কুশলী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এই গুণী শিল্পী। বিজয়ের মাসে গুণী এ ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হয়েছে। সে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ব্যক্তিগত জীবন, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা আন্দোলন, নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ।

রাজনীতি, খেলাধুলা, গান, অভিনয়-সব বিষয়ে আপনার সমান দক্ষতা ছিল কিন্তু লোকে তো আপনাকে অভিনেতা হিসেবে ভাবতেই বোধহয় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে…
কিন্তু জানো ছাত্র জীবনে আমার ঝোঁকটা বেশি ছিল খেলাধুলার প্রতিই। অন্যান্য স্টেটের বিরুদ্ধে আমরা খেলে জয়লাভ করতাম। পাঁচটা ফরওয়ার্ডে খেলা হত। আমি রাইট ইনসাইডে খেলতাম আর লেফট ইনসাইডে আমার সাথে খেলতো চুণী গোস্বামী। সে পরবর্তীতে ভারতের ফুটবল দলের ক্যাপ্টেনও হয়েছিল। আমাদের বিরুদ্ধে বিহার স্কুলে খেলত পিকে ব্যানার্জী। সে ভারতের ক্যাপ্টেন ও কোচ দুটোই হয়েছিল। কিন্তু আমাকে একসময় খেলা ছেড়ে দিতে হল। আরামবাগ বলে একটা জায়গা আছে সেখানে একবার খেলতে গিয়ে আমার হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। তখন চিকিৎসা ব্যবস্থা অত ভালো ছিল না, তাই বাধ্য হয়েই খেলাটা আমাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। ফুটবল ছেড়ে দিয়েছিলাম কিন্তু খেলাধুলা পুরোপুরি ছাড়লাম না। ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার পর ক্রিকেটের দিকে মনোযোগী হলাম। তখনকার কলেজগুলো সব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল, ক্রিকেটে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেনিং ব্যাটসম্যান ও উইকেট কিপার ছিলাম। দু’বছর সেখানে খেলেছি।

খেলার জন্যই নাকি আপনার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ হয়েছিল?
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। সেও এক মজার ঘটনা। আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পরপরই বর্ধমান ইঞ্জিনিয়ার কলেজের স্পোর্টস টিচার প্রতিদিন আমাদের বাড়িতে এসে বসে থাকতেন। আমাকে তিনি বলতেন আয় ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হ, ক্রিকেট টিমটা ভালো করে গড়ব, তুই আমাদের টিমে খেলবি। আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল না, তবুও তিনি প্রতিদিন এসে বলতেন লোকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে চান্স পায় না, সিট পায় না আর তোকে আমরা আদর করে ডাকছি তুই রাজিই হচ্ছিস না! আমি বলতাম- না, আমি জেনারেল লাইনে পড়ব কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা আমাকে ছাড়তেনই না। ওনার ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে শুনতে শেষ পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলাম। মজার বিষয় হল আমাকে বেতনও দিতে হত না, আমার বেতন মওকুফ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই বর্ধমান ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকেই আমি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করি। এমনকি আমাকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এসোসিয়েশনেরও জেনারেল সেক্রেটারি বানানো হয়। কেমন করে যেন সবাই আমার নেতৃত্ব মেনে নিত।

আপনার তো খুব ভালো গানের গলা ছিল, গানের জন্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন। গানটা ছাড়লেন কেন? অভিনয়ের জন্য?
না, না। তা হবে কেন? ছোটবেলা থেকেই গান করতাম। এক বছর ক্লাসিক্যাল শিখেছিলাম। ক্লাসিক্যাল শেখার পরই আমার গলায় সমস্যা দেখা দেয়। এখানেও ফুটবলের মতো গান ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। গানের জন্য যে পুরস্কারের কথা তুমি বলছো সেটা খুব ছোটবেলায় পাওয়া। সম্ভবত ১৯৫০ সালে ইডেন গার্ডেনে একটা ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল হয়েছিল। সেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে পুরস্কার পেয়েছিলাম। কলেজের প্রোগ্রামগুলোতেও রবীন্দ্রসঙ্গীত ও আধুনিক গানে আমি প্রথম হতাম। সে সময় বর্ধমানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও আমি গান গাইতাম।

হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে ভালো খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও ফুটবল ছাড়লেন, অসাধারণ সঙ্গীত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও গান ছাড়লেন, এই যে দুটি উজ্জ্বল প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন, হতাশা কাজ করেনি কোনো?
আমার জীবনে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটেছে। ফুটবলে যখন আমি টপ ফর্মে তখন পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ল, গান যখন ভালো গাইছি, লোকে প্রশংসা করছে তখন গলাটা নষ্ট হয়েছে। ফুটবল যখন ছাড়ি তখন আমি ভীষণ কেঁদেছিলাম।

এত এত প্রতিভার উৎসটা কী ছিল?
আমার পরিবারই এই উৎসের যোগান দাতা। তবে আমার একটা অভ্যাস ছিল সবকিছু আমি দ্রুত শিখে ফেলতাম। সাইকেল আমি একদিনে শিখেছি, মটরগাড়ি চালানো একদিনে শিখেছি, সাঁতার কাটাও একদিনে শিখেছি। সহজে শিখে ফেলা যেমন গুণের, আবার দোষের কারণ বটে। কারণ সহজে সব শিখে ফেললে তার মূল্যটা মানুষ বুঝে না। আমার যে গানের গলাটা এত ভালো, গলা সুস্থ থাকা অবস্থায় আমি বুঝতেই পারিনি। অন্যরা যেভাবে এপ্রিশিয়েট করত আমি তেমন পাত্তাই দিতাম না, ভাবতাম সবাই গান গাইতে পারে। এই সহজে সব কিছু পাওয়ার কারণে আমার জীবনে কোনো লক্ষ্যও ছিল না।

জীবন নিয়ে অতৃপ্তিবোধে ভোগেন, কিংবা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে?
মোটেও না। আমি তো মনে করি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য না থাকার কারণে আমার বন্ধু ভাগ্য ঈর্ষনীয়। আমি কোনোদিন পেশাগত কারণে কারোর সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। দ্বন্দ্ব থাকত যদি আমার কিছু হওয়ার চেষ্টা বা আকাঙ্ক্ষা থাকত, সেটা তো আমার ছিল না। যখন যে এসে কোনো পদ বা কোনো কিছুই ছেড়ে দিতে বলেছে আমি ছেড়ে দিয়েছি। কারো সঙ্গেই আমার কোনো প্রতিযোগিতার সম্পর্ক ছিল না। আর তা ছাড়া জীবনে না চাইতেই তো অনেক কিছু পেয়েছি। মানুষের এত এত ভালোবাসা আমার জন্য, আমার আর কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে বল তো? এই ভালোবাসার ঋণ-ই তো আমি শোধ করতে পারব না কোনোদিন।

রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থেকেও, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য বহন করেও সরাসরি নিজেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়ালেন না কেন?
ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পরবর্তীতে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে জড়াইনি বা কোনো দলেও যোগ দেইনি। কিন্তু তখনো এবং এখনো যে কোনো জাতীয় রাজনৈতিক সঙ্কটে রাজনৈতিক কাজ করতে হয় এবং আমি তা করিও। কোনো দলের হয়ে না, নির্দলীয়ভাবে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে আমাকে রাজনীতির সংস্পর্শে থাকতে হয়।

ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর কী বর্ধমানেই থেকে গেলেন? পেশা জীবন শুরু করেন কোথায়?
না। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর দাদা বাড়ি বাগেরহাটে এলাম। খান জাহান আলীর মাজার যেখানে, সেটাই আমাদের গ্রাম। দর্শনা সুগার মিলে আমার চাকরি হল। বঙ্গবন্ধু আমাকে ছোট থেকেই চিনতেন যেহেতু আমার নানা বাড়িতে রাজনৈতিক কারণে তার যাতায়াত ছিল। একদিন ঢাকায় এলাম, তিনি আমাকে খবর পাঠালেন যে নূরুদ্দিন ভাইয়ের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হবে, সেখানে আমাকে গান গাইতে হবে। খান আতা তখন মাত্র ইংল্যান্ড থেকে ফিরেছেন। নূরুদ্দিন ভাই বরিশালের লোক ছিলেন, আব্দুল লতিফ ভাইও তাই। লতিফ ভাই নূরুদ্দিন ভাইয়ের মেয়েকে গান শিখাতেন। নূরুদ্দিন ভাই বঙ্গবন্ধুদের বন্ধু ছিলেন। আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ এর আগ পর্যন্ত এমপি ছিলেন, বড় ব্যবসায়ীও ছিলেন। বিশাল বিষয় সম্পত্তি ছিল তার। মতিঝিলে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, এখন যেটা সোনালী ব্যাংকের হেড অফিস সেই বিল্ডিংটা তার ছিল, বলাকা সিনেমা হলসহ অনেক প্রোপার্টি ছিল নূরুদ্দিন ভাইয়ের। মার্শাল ল’ আসার পর ওনাকে জেলে নিয়ে ওনার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নূরুদ্দিন ভাইয়ের বাসার সেই অনুষ্ঠানে গান গাইতে গেলাম। বঙ্গবন্ধুও ছিলেন সেখানে, যতদূর মনে পড়ে তিনি তখন কমার্স মিনিস্টার। সেখানে রশিদ সাহেব নামে আরেকজন উপস্থিত ছিলেন যিনি সেই সময়ের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের জোনাল হেড। আমার গান শুনে নূরুদ্দিন ভাই আমাকে ডেকে বলল-তুই কোথায় আছিস? আমি বললাম দর্শনা সুগার মিলে। উনি বললেন না, তুই ঢাকায় থাকবি, গান শিখবি। আমি বললাম-ঢাকায় কোথায় থাকব, কী করব? উনি রশিদ সাহেবকে বললেন-কালকে ওকে একটা ব্যাংকে চাকরি দিয়ে দেন তো। রশিদ সাহেবও পরদিন সকালে অফিসে যেতে বললেন। ওদের হেড অফিস তখন সদরঘাটে। আমি গেলাম এবং সত্যি সত্যিই তিনি আমাকে একটা চাকরি দিয়ে দিলেন। আমার জীবন যে লক্ষ্যহীন সেটা এবার খেয়াল করলে? ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়েও, আমাকে হতে হল একজন ব্যাংকার!

Facebooktwittergoogle_pluspinterestlinkedin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *